Govt. Reg No: Dho-09661
Since: 2014
Founder: Milton Samadder

"A Non-Profit Charity Organization"

Page View: 545,971 | Online: 2
child.oldagecare@gmail.com
+88 02 58050680, +88 01620 555222

মিল্টন দম্পতির ৫১ মা-বাবা

posted: 5 months ago | By: Milton Samadder



‘কেউ চাল দেয়, কেউ দেয় ডাল, কেউ ডিম বা চা পাতা দেয়। আবার পুরনো হাঁড়িপাতিল, কাপড়চোপড়, কাপ-পিরিচ দেয়। যে যেভাবে পারে, সাহায্য-সহযোগিতা করে। তাদের সাহায্যেই টিকে আছে এই বৃদ্ধাশ্রম।’




একদমে কথাগুলো বলছিলেন ৩২ বছরের তরুণ নার্স মিল্টন সমাদ্দার। যিনি রাস্তা থেকে খুঁজে খুঁজে অসহায়, আশ্রয়হীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আশ্রয় দিতে রাজধানীর কল্যাণপুরে ভাড়া বাড়িতে গড়ে তুলেছেন বৃদ্ধাশ্রম-চাইল্ড এন্ড ওল্ড এজ কেয়ার। রাতদিন নেই কেউ যদি বলে, অমুক জায়গায় একজন অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন, ছুটে যান সেখানে।

কিভাবে গড়ে উঠল এই বৃদ্ধাশ্রম-এমন প্রশ্নে মিল্টন বলেন, ‘আমি-তো নার্স। হাসপাতালে চাকরির পাশাপাশি অনেকের বাসায় গিয়ে তাদের অসুস্থ বৃদ্ধ মা-বাবাদের দেখাশোনা করি। তো একদিন বিল আনতে গিয়েছিলাম। আসার পথে আগারগাঁওয়ে দেখি এক বৃদ্ধ রাস্তার পাশে পড়ে আছে। কি মনে হলো, তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার সাথে যাবেন? আপনাকে বাবার মতো রাখব।’ তার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সে তার নাম-ঠিকানা পর্যন্ত বলতে পারেনি। সেটা ২০১৪ সালের কথা। মাথায় চেপে বসে অসহায় মানুষের সেবা করার নেশা। এরপর তাকে নিয়ে এলাম। এভাবেই শুরু...। এখন আমার ৫১ জন বাবা-মা। এদের নিয়েই আমার সংসার!’





মিল্টন বলেন, আগারগাঁও থেকে ঐ বৃদ্ধকে আনার পর খেয়াল করি তার পা কাপড় দিয়ে বাঁধা। কাপড় খুলে দেখি সেখানে পচে গেছে। গন্ধ বের হচ্ছিল। তাকে তো ফেলে দিতে পারি না। প্রথমে তাকে আমার বাসাতেই রাখি। এরইমধ্যে মিরপুর থেকে আরেকজন বৃদ্ধকে নিয়ে এলাম। এরপর কল্যাণপুরে একটি টিনশেড বাসা ভাড়া নিয়ে তাদের রাখি। এভাবেই একজন একজন করতে করতে এখন ৫১ জন রয়েছেন। আরও বেশি ছিল। অনেকেই মারা গেছেন। আবার আমি নিয়ে আসার পর ফেসবুকে ছবিসহ দিলে তাদের আত্মীয়-স্বজন এসে নিয়ে গেছেন।

সম্প্রতি কল্যাণপুরে পাশাপাশি দুই বাড়ির নিচতলার দুই ইউনিট নিয়ে গড়ে ওঠা বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দেখা যায়, এখানে ১৬টি রুমে ৫১ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন। এরমধ্যে ২৯ জন বৃদ্ধ, ২২ জন বৃদ্ধা। এদের মধ্যে কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন। বয়সের ভারে অনেকেই এতটা ভেঙে পড়েছেন যে, টয়লেটে পর্যন্ত যেতে পারেন না। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল মতিন জানান, তার বাড়ি খুলনায়। তিনি মিরপুরে থাকতেন। একসময় একটি ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করতেন। ২০০৭ সালে একমাত্র ছেলে মারা যায়। তবে ছেলের বউ ও নাতি আছে। নাতি মিরপুর কমার্স কলেজে পড়ে। নাতি আসে মাঝে মধ্যে। আর দুই মেয়ে খুলনায় বিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, মেয়েরা আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু আমি যাইনি। এখানে তিনি ভালো আছেন বলে জানান।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক আব্দুল হালিম এখানে আছেন বলে জানালেন, এই বৃদ্ধাশ্রমের কর্মচারী মিরাজ। তাকে উনার এক ছাত্র দিয়ে গেছেন বলে তিনি জানান। তবে তার কোনো আত্মীয়-স্বজন আছে কি না তা তারা বলতে পারেননি।

বছরখানেক আগে রাজধানীর তিনশ’ ফিট রাস্তায় বস্তায় ভরে একটি মানুষকে ফেলে দিয়ে যায় তার পরিবারের মানুষরা। পরে বস্তা খুলে পাওয়া যায় এক বৃদ্ধাকে। সেই রাবেয়া বশিরও রয়েছেন এই বৃদ্ধাশ্রমে।





বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের যারা দেখাশোনা করেন তাদের একজন রিমা। তিনি বলেন, মা-বাবার মতো করে তাদের আগলে রাখতে হয়। এখানে অনেকেই বাথরুমে যেতে পারেন না। প্রতিদিন ভোরে তাদের রাথরুম পরিষ্কার করার মধ্যে দিয়ে তার দিন শুরু হয়। এরপর সবার প্রেসার মাপেন। সকালে সময়মতো নাস্তা দেন। তবে অনেককেই খাইয়ে দিতে হয়। প্রতিদিনের খাবার মেন্যু সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো খাবারের বিষয় নেই। যেহেতু অন্যের সাহায্য-সহযোগিতায় বৃদ্ধাশ্রম চলে। তাই যেদিন যে রকম খাবার আসে। সেদিন সেই খাবারই দেওয়া হয়। এখানে সবাই একই রকম খাবার খান বলে তিনি জানান।

এদের খাওয়া-দাওয়া ভরণপোষণ কিভাবে চলে-এ প্রশ্নে মিল্টন সমাদ্দার বলেন, ২০১৪ সালে যখন আমি শুরু করি। তখনতো আমার ইনকাম অনেক ভালো। মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করি। তো এর পেছনে আর কত যাবে? তাই টাকা নিয়ে ভাবিনি। কারণ তখনতো আমি চিন্তা করিনি আমার এটা বৃদ্ধাশ্রম হবে। এক-দুইজনকে আশ্রয় দিয়েছি এতটুকুই। একজন-দুইজন করে ধীরে ধীরে এ অবস্থায় এসেছে। এখন এর পেছনে সময় দিতে গিয়ে আমি চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি। তবে এখন আমি একটি নার্সিং এজেন্সি চালাই। যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সেবা দেয়। এছাড়া আমার স্ত্রী একটি সরকারি হাসপাতালের নার্স। আমাদের দু’জনের আয়ের টাকা আমরা বৃদ্ধাশ্রমে দেই। আমার এমন সময় যায়, পকেটে এক টাকাও থাকে না। যখন জরুরি ওষুধপত্র লাগে তখন সমস্যায় পড়ে যাই। তবে সাধারণ মানুষ আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে। আমাদের ফেসবুক পেজে ছয় লাখ শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন। সবার সাহায্যেই টিকে আছে এই বৃদ্ধাশ্রম। তিনি বলেন, সম্প্রতি এলাকার কিছু সন্ত্রাসী চাঁদা চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আমার উপর হামলা করেছিল। হাসপাতাল থেকে গতকালই ফিরেছি। আমি এর বিচার চাই।




বরিশালের উজিরপুরের সন্তান মিল্টন বলেন, আমার কোনো সঞ্চয় নেই। পাঁচ বছরের একটি ছেলে আছে আমাদের। তাকে পড়াশুনা করিয়ে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আর সরকারের কাছে একটাই চাওয়া- বৃদ্ধাশ্রমের জন্য একটি স্থায়ী জায়গা। জীবনের শেষ দিনগুলো যাতে অসহায় বৃদ্ধ মানুষরা একটু আনন্দে, ভালোবাসায় কাটাতে পারে এই চেষ্টাটুকু আমাদের সবার করা উচিত।